Monday, May 23, 2016

ফেরআউনের প্রাসাদে যেভাবে প্রতিপালিত হলেন হজরত মুসা [আ.]



হজরত মুসা আ.-এর মা মুসা অ.-কে নীলনদে ভাসিয়ে দিয়ে তার বোনকে বলে দিয়েছিলেন তার প্রতি লক্ষ রাখতে। সহোদরা বোন নদের তীর ধরে ভাসমান সিন্দুকটির ওপর দৃষ্টি রেখে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন, সিন্দুকটি ভেসে ভেসে রাজপ্রাসাদের কাছে এসে থামলো। ফেরআউনের পরবিারের একজন রমণী তাঁর চাকরদের দিয়ে নদ থেকে সিন্দুকটি উঠিয়ে নিলেন এবং রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন। হজরত মুসা আ.-এর বোন তা দেখে খুবই আনন্দিত হলেন। প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে জানার জন্য তিনি রাজমহলের চাকরানিদের সঙ্গে মিশে গেলেন।
কুরআনুল কারিম রাজবংশের এই স্ত্রীলোকটিকে ফেরআউনের স্ত্রী বলেছে। আর তাওরাতের ‘আত্মপ্রকাশ’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, এই নারী ছিলেন ফেরআউনের কন্যা। কিন্তু ইতিহাসবেত্তাগণ এই মতানৈক্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেননি। তাঁরা বলেন, সম্ভবত পানিতে ভাসমান সিন্দুকটিকে ফেরআউনের কন্যাই উঠিয়ে নিয়েছিলো। তারপর সিন্দুকের শিশুটিকে পুত্র বানিয়ে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা, শিশুটিকে হত্যা না করে নিজেরাই লালন-পালন করার আগ্রহ প্রকাশ এবং ফেরআউনের কাছে সুপারিশ করেছিলেন ফেরআউনের স্ত্রী আসিয়া।
কুরআনুল কারিমের বর্ণনাপদ্ধতি থেকেও এ-কথাই প্রকাশ পায়। কারণ, হজরত মুসা আ.-কে নদীর বুক থেকে উত্তোলনকারী প্রসঙ্গে কুরআনুল কারিম বলেছে— ‘তখন ফিরআউনের (পরিবারের) লোকজন তাকে (শিশু মুসাকে) উঠিয়ে নিলো।’ [সুরা কাসাস : আয়াত ৮]
আর পুত্ররূপে গ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষা এবং হত্যা না করে প্রতিপালন করার জন্য সুপারিশকারী সম্পর্কে কুরআন বলছে—
وَقَالَتِ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ قُرَّةُ عَيْنٍ لِي وَلَكَ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
‘ফেরআউনের স্ত্রী বললো, “এই শিশু আমার ও তোমার নয়ন-প্রীতিকর। একে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে আসতে পারে, আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।’ [সুরা কাসাস : আয়াত ৯]
‘ফেরআউনের স্ত্রী বললো’-এর হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রহ. থেকে এমন বক্তব্যই বর্ণিত হয়েছে। যাই হোক, ফেরআউনের লোকেরা সিন্দুকটি খুলে দেখতে পেলো, একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান শিশু সিন্দুকটির ভেতরে আরামে শুয়ে আছে এবং বুড়ো আঙ্গুল চুষছে। ফেরআউনের কন্যা তৎক্ষণাৎ তাকে রাজমহলে নিয়ে গেলো। ফেরআউনের স্ত্রী শিশুটিকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। অত্যন্ত মায়া-মমতার সঙ্গে শিশুটিকে আদর করলেন।
রাজমহলের অভ্যন্তরীণ চাকরদের মধ্যে কেউ বলে উঠলো, ‘এই শিশুটিকে তো বনি ইসরাইলের বলে মনে হচ্ছে । এ তো আমাদের বংশের শত্রু। এতে হত্যা করে ফেলা জরুরি। পাছে এমন না, এই শিশুই আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।’ এ-ধরনের কথা শুনে ফেরআউনের এমনটাই ইচ্ছে হলো। ফেরআউনের স্ত্রী ফেরআউনের হাবভাব দেখে বলতে লাগলেন, এমন সুন্দর ও আদরণীয় শিশুটিকে হত্যা করো না। বিচিত্র কি যে, এই শিশু তোমার ও আমার চোখের প্রীতিদায় হবে। অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেবো এবং তার জীবন ও অস্তিত্ব আমাদের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ এই শিশু যদি সেই ইসরাইলি শিশুই সাব্যস্ত হয়, যে হবে তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যার উদ্দেশ্য, তবে আমাদের ভালোবাসা ও প্রতিপালনের কোল হযতো তাকে ক্ষতিকর হওয়ার পরিবর্তে কল্যাণকর করে দেবে। কিন্তু ফেরআউন ও তার বংশের লোকেরা কি জানতো যে, আল্লাহপাকের অদৃষ্টলিপি তাদের প্রতি হাসাহাসি করছে। রাব্বুল আলামিনের অপার মহিমা লক্ষ করুন, ফেরআউনকে সম্পূর্ণ ও অজ্ঞ ও অনবহিত রেখে তাকে তার শত্রুর রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে দিলেন।

No comments:

Post a Comment